Ebong Aranya Blog

দার্জিলিং ও ডুয়ার্স

কথায় বলে প্রকৃতি বলতে পরিবেশ জুড়ে যে প্রাণের অস্তিত্ব, তার সবটুকু। গাছপালা পশুপাখির বাইরে আমরা মানুষরাও সেই প্রকৃতিরই অন্তর্গত। এই মানবপ্রকৃতির একটা অংশ ঘরের কোণে একটি মাত্র মোমের আলো নিয়ে সেই আবছায়াকেই ভালোবেসে আজীবন কাটিয়ে দেন। আর এই গোষ্ঠীর বাইরে, এক অদ্ভুত বেদুইন মননের একদল মানুষ থাকেন, যাদের দিন ঘুরিয়ে রাত্রি নামে বেড়াতে যাওয়ার সম্বল সঞ্চয়ে। আমরা বাঙালিরা হলাম সেই দ্বিতীয় প্রকারের গোষ্ঠী বিশেষ। সম্বৎসরে এক দুবার তো আমরা বেরোয়ই। পারলে মাঝেমধ্যে আরও দু-একটা ছোটোখাটো বেড়ানোর নিভৃতি পেলে সোনায় সোহাগা হয়ে পড়ে আমাদের দিনযাপন। গুলমার্গ হোক বা গুর্জ্জরদেশ, আফগান হোক, বা আমস্টারডাম, কোথাও বিচরণ করতেই আমরা কখনও নিবৃত্ত হইনা। তবে, এই সাত সমুদ্র চব্বিশ নদী চোখের নিমেষে পার করলেও, আমাদের মনের ভিতরে যে একফালি ছোট্ট আকাশনীল রঙের পর্দা দেওয়া আদরঘর আছে, সেই ঘরটায় আজন্মকাল বিরাজ করে একটি ছোট্ট পাহাড়ঘেরা শহর ; দার্জিলিং যার নাম।

বাঙালির কাছে ইন্ডিয়ান কফি হাউস কিংবা শান্তিনিকেতনের ভুবনডাঙার মাঠ যেমন একটা ভিন্টেজ ক্লাসিসিজমের আবেগ, তেমনই দার্জিলিং হল একটা নস্টালজিয়া। সাহেবদের হাতে তৈরি এই ছোট্ট পাহাড়ি শহরটার প্রত্যেকটা ইমারত সেই স্থাপত্যের কথা বলে। গ্লেনারিজ হোক বা বাতাসিয়া লুপ, ম্যালের ধারে রঙীন ক্যান্ডিফ্লস, মহাকাল মন্দিরের দিকের রাস্তাটার নিস্তব্ধতা, আর ছোট্ট ছোট্ট টয়ট্রেনের লাইনগুলো.... সবটুকু মিলিয়ে তুলো দিয়ে মুড়ে রাখা একটা শীতের সকাল, যেন একটুকু অপচয়েই ফুরিয়ে যাওয়ার, হারিয়ে যাওয়ার জড়তায় মোড়া।

তবে, এই নানা রঙের নুড়িগুলোকে খুব অনায়াসে অথবা খুব ভালোবেসে যে ধারণ করেছে, তার নাম হিমালয়। কাঞ্চনজঙ্ঘা তার বন্ধু বন্ধুনীদের সঙ্গে নিয়ে পাহাড় থেকে তরাই হয়ে ডুয়ার্স অব্দি মায়া ছড়িয়ে রেখেছে পথে বিপথে। শল্কমোচনের মতন আমরা তার একটির পর একটি পরত খুলতে থাকি.... নতুন পাহাড়িয়া গ্রাম আবিষ্কার করি.... আর কাঞ্চনের মোহাবেশে ক্ষুধিত পাষাণের মেহের আলির মতন আবিষ্ট হয়ে পড়ি। যে একবার এই কাঞ্চনকে ভালোবেসেছে, সে আর কোনোদিন এই মোহাবেশ ছেড়ে বেরোতে পারেনি।

কার্শিয়াং, কালিম্পং, লাভা কিংবা লোলেগাঁও, এই মাইলস্টোনগুলো পেরিয়েও আরও ভিতরে আরও কাছে চলে গিয়ে পৌঁছানো যায় কোনো পথে রিশপ, ইচ্ছেগাঁও, সিলারি গাঁও কিংবা কোলাখাম, ঝান্ডি, চুইখিম। অথবা অন্য পথে লেপচাজগৎ, লামাহাটা বা তিনচুলে, বড়া মাংগওয়া, ছোটা মাংগওয়া কিংবা ঘুমপাহাড়। আর এইসব ছোটো ছোটো গ্রামের দিকে প্রেমিকের মতন অক্লেশে চেয়ে থাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা। এ পথে, ও পথে, বিভিন্ন বাঁকের ভিতর দিয়ে লুকালেও যার নজর এড়ানো যায়না। দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের রঙের কৌটো থেকে রঙ চুরি করে বিভিন্ন রঙে সে সাজে। প্রতিদিন যেন সেই বরফ-পাহাড়ের দেশে দোল-উৎসব চলে। আর রঙ হল ছোঁয়াচে রোগের মতন। ওই রঙীন পরশপাথরের ছোঁয়ায় সে আপনাকে রাঙাবেই..... মার্চের শেষ থেকে সিকিম আর এদিককার দার্জিলিং জেলার আশপাশের পার্বত্য উপত্যকায় হাজার রঙা রডোডেন্ড্রণ ঝাড় হয়ে ফুটে থাকে, মনে হয় পাহাড়ে পাহাড়ে আগুন লেগে গেছে। বীরভূম-পুরুলিয়ার পলাশ-ফাগুনের দিনে যারা মাতাল হয়ে পড়েন, ওই পাহাড়িয়া ফুলেদের রঙ্গোৎসব তাদের আনন্দ দেবেই।

চা-বাগান, ফুলের, ফলের কিংবা সব্জির বাগিচায় ভর্তি একের পর ছোটো ছোটো পাহাড়ি গ্রাম ; যে গ্রামগুলোর পথ চলে গেছে রডোডেনড্রন, ওক, বাঁশ, শাল, পাইন এইসব গাছে ঘেরা নেওড়া উপত্যকা অভয়ারণ্যের ভিতর দিয়ে। কালিম্পং পাহাড়ের ৭ থেকে সাড়ে ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় ৮৮ বর্গকিলোমিটার জুড়ে নেওড়া ভ্যালি জাতীয় উদ্যানের জঙ্গল ঘেরা পাহাড়ি পথের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে কখনও দেখা মেলে হিমালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের, কখনো জায়ান্ট গোল্ডেন ক্যাট, ওয়াইল্ড বোর, বার্কিং ডিয়ার বা সম্বর হরিণের মতন বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণের। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে পাহাড়ি লেপার্ড বা রেড পন্ডাও চোখে পড়তে পারে। খুব সম্প্রতি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারেরও দেখা মিলেছে এই নেওড়ার জঙ্গলেই। আর নেওড়া অভয়ারণ্য তো পাখিদেরই ঠিকানা। উইকিপিডিয়ার পেজগুলোতে লেখা থাকে তাদের বাহারি নাম। এই অভয়ারণ্যের ভিতরে বেশ কয়েকটি ট্রেক-পথও আছে। পাহাড়কে যারা হেঁটে ঘুরে আবিষ্কার করতে পছন্দ করেন, এ জঙ্গল তাদের জন্য স্বর্গরাজ্য। তবে বন্যপ্রাণ ও আপনার, উভয়ের নিরাপত্তার কারণেই অবশ্যই প্রশিক্ষকের সঙ্গেই এ পথে চলা বাঞ্ছনীয়।

কেবল কি পাহাড়ই ভালোলাগা দেয়..? পাহাড়ের সাথে নদীর ভালোবাসার গল্পটা তো খুবই সুপরিচিত। তিস্তা-তোর্সা-জলঢাকা-রায়ডাক'রা তো প্রাচীন সাধিকার মতন। বিশাল বিপুল তাদের অস্তিত্ব। কিন্তু পাহাড়ি পথে নেওড়া, রঙ্গিত, চেল, হলং, বাংরি, ডুলুং, তিতি, মূর্তি, কালচিনি এইসব নদীগুলো...? এদের প্রত্যেকের মধ্যে সেই কুমারীর প্রেমের মতন উচ্ছ্বলতা, সামান্য মোহন টানেই যারা বানভাসি হয়ে পড়ে। বহু বছর ফেলে আসার পর একদিন দুপুরের ফাঁকা স্কুলবাড়িতে ফেরা যেমন একইসাথে কষ্ট আর আনন্দের অনুভূতি দেয়, এইসব নদীদের কাছে গিয়ে পা ডুবিয়ে বসলে ঠিক তেমনই অকিঞ্চিৎকর রোমাঞ্চ জাগে যখন তখন।

পাহাড় থেকে নেমে আসা পথে মেলে তরাই আর ডুয়ার্সের বনভূমি। মহানন্দা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাঞ্চুয়ারি, গোরুমারা ন্যাশানাল পার্ক, চাপড়ামারি ন্যাশানাল পার্ক, জলদাপাড়া ন্যাশানাল পার্ক বা চিলাপাতার মতন একাধিক জঙ্গলভূমি। অবশ্যই এর সাথে আছে বক্সা টাইগার রিজার্ভ। শাল, সেগুন, মেহগিনি, শিরিশ, শিমূল, খয়ের ছাড়াও আরও কত বৃদ্ধ বনস্পতির ছায়ায় ঘেরা কয়েকশো বর্গকিমি জুড়ে একটা অঞ্চল, যা কিনা হাতি, বাইসন, লেপার্ড, বিখ্যাত একশৃঙ্গী গন্ডার, বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ, সরিসৃপ আর পাখিদের ঘরবাড়ি।

কিন্তু, শুধু কি বন্যপ্রাণ আর বৃহৎ শ্যামলিমাই সুন্দর করেছে এই ডুয়ার্সকে..? না। জলপাইগুড়ির প্রতিটি মানুষের মধ্যে আছে এক অনাবিল আতিথেয়তা, অমলিন আন্তরিকতা, যা আপনাকে মুগ্ধ করবেই। চা-বাগানের ধ্বস্ত শ্রমিক হোন, বা কাঠ চেড়াই কলের শ্রমিক, রাস্তার পাশের পাইস হোটেলের ম্যানেজারবাবু হোন, বা লাটাগুড়ির অরণ্য জাঙ্গল রিসর্টের ঠাকুরবাবু, এদের প্রত্যেকের আন্তরিকতা মুহূর্তে মুহূর্তে আপনাকে কানে কানে এসে বলবে, আপনি সত্যিই তথাকথিত সভ্যতার এলিগেন্সি থেকে অনেকখানি দূরে এক জংলি মাধুর্য্যের সূর্য ধোয়া বাষ্প-বাতাসে নিজেকে দ্রবীভূত করতে এসেছেন। গরুমারা জঙ্গলের কাঞ্চা লামা, হলং বাংলোর রাজু, বক্সা বাঘ বনের নীতু কিংবা জয়ন্তীর অর্ঘ্য, এরা নিছক বনকর্মী বা গাইডই নয়, এদের সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্তে আপনি বুঝতে পারবেন জঙ্গলের এক সাবলীল ভেকহীন সততা আর নির্জনতা এদের সকলের মধ্যেই প্রথিত আছে কোথাও।

আসলে, বন-পাহাড়-জঙ্গল-নদী-বন্যপ্রাণের দলিল দস্তাবেজ তৈরির কারখানা অন্যান্য সমস্ত ওয়েব পেজে পাওয়া যায়। কিন্তু যা মেলেনা, সেই বনপাহাড়ের অমোঘ মায়ার খানিকটুকুর হদিশ দেওয়ারই চেষ্টা করি আমরা ; আমরা, 'এবং অরণ্য'।

যে কোনো অরণ্য ভেকহীন সৎ সাবলীল অকপট এক বৃহৎ সত্ত্বা নিয়ে খুব ধীরে ধীরে নিজেকে উন্মোচন করে ভালোবাসার মানুষের কাছে। জোর করে জাপটালে তাকে চেনা যায়না। বয়স হলে যেমন প্রেমে পাক ধরে, তেমনি অরণ্যকে ভালোবাসতে হয় বড় নিবিড় করে, বড় যত্ন করে, সময় দিয়ে। আমরা, 'এবং অরণ্য' সেই ভালোবাসার শরিক হয়েছি। আর তারই একটুকু ছোঁয়া আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে আমরা সদা-সক্রিয়। আমরা বাণিজ্যিক অবশ্যই, তবে এ বাণিজ্যে দেয়া-নেয়া হয় ভালোলাগার বিনিময়ে। দিনমানের প্রহর নির্মাণের ইঁদুর-দৌড়ে যারা ক্লান্ত হয়ে পাহাড়ে-জঙ্গলে নিস্তব্ধতা খুঁজতে আসেন, আমরা তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে চাই সেই লক্ষ্যে।

ট্যোর অপারেটার হয়ে কাগুজে রোজনামচার বিবৃতি পালন আমাদের লক্ষ্য নয়। যে মানুষ তাঁর ব্যস্ত জীবন থেকে সাতটি দিন সময় ব্যয় করেন জঙ্গলে বা পাহাড়ের নিভৃতিতে, আমাদের লক্ষ্য থাকে তাঁরা যেন সেই নিভৃতিতে পৌঁছান, যেখানে নিজের অস্তিত্বে পরশপাথর ছোঁয়ানো যায়।

সহযাত্রীদের সাধারণ সুবিধা-অসুবিধার দিকগুলোও আমরা আন্তরিকভাবেই খেয়াল রাখার চেষ্টা করি। প্রত্যেক যাত্রীর ভ্রমণের উদ্দেশ্য ও আকাঙ্ক্ষা বুঝে সেই অনুযায়ী বেড়ানোর সূচী নির্মাণে আমরা সদা প্রয়াসী। যে জায়গায় আপনি বেড়াতে যাবেন, সেইখানকার স্থানীয় যা কিছু বিখ্যাত অথবা শ্রেষ্ঠ, তা আপনাদের সামনে হাজির করতে আমরা বদ্ধপরিকর। যেমন, উত্তরবঙ্গে জঙ্গলে যিনি যাচ্ছেন, তাকে অবশ্যই স্থানীয় বিখ্যাত নদীর মাছ, 'বোরোলি', কিংবা বাদামী আলুর দম খাইয়ে রসনা তৃপ্তি মিটাই। কিংবা, জঙ্গলে যে জায়গাগুলি ভ্রমণ করলে জঙ্গল কিংবা বন্যপ্রাণের দর্শন সর্বাধিক অনুকূল, সেখানেই আমরা আপনাদের নিয়ে যাই। সচরাচর জঙ্গল ভ্রমণে সাফারি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। সেই সাফারির টিকিট সংগ্রহ কিংবা দক্ষ গাইড সঙ্গে নেওয়ার প্রক্রিয়াটিও আমরা সম্পন্ন করি আমাদের অতিথিদের বাড়তি বিড়ম্বনা না দিয়েই।

যেহেতু আমরা নিজেরা ঘুরতে ভালোবাসি, সেইজন্য অতিথিদের ঘোরাতে নিয়ে যেতেও আমরা ততটাই আনন্দ পাই। আমরা পাহাড়ে জঙ্গলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভালোবেসে ঘুরে ফিরে বেরিয়েছি। আর তাই চাই, আপনিও সেই ভালোবাসার শরিক হন। সেই চেষ্টাতেই এই নতুন প্রয়াস, 'এবং অরণ্য'।

এই প্রয়াসে আপনাদের সীলমোহরের অপেক্ষায় আমরা.... 'এবং অরণ্য'।

লেখা - বর্ষা চক্রবর্তী

ভূটান

ঠাকুমার ঝুলিতে পড়া রাজা- রাণীর গল্প। আমাদের রাজা নেই বলে ভারী দু:খ হত। অনেক ছবি-ছাবা-গল্প-গাছা পেরিয়ে প্রথম বাস্তবের রাণী র ছবি দেখলাম- ইংল্যাণ্ডেশ্বরী। তো তার রাজত্বে তো আর যাওয়া হল না। যাঁর রাজপাট দেখে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ফিরলাম, তিনি জিগমে খেশর নামগিয়েল ওয়াংচুক।

হাত বাড়ালেই আরশিনগর এর মত, হাত বাড়ালেই বিদেশ এর স্বাদ - ভুটান। বিদেশ অথচ কী ভীষণ আপন। প্রতিবারের মত এন জে পি তে না নেমে মায়াজঙ্গলে ট্রেনযাত্রা করে হাসিমারা,সেখান থেকে জয়গাঁও। সীমান্তশহর!! বেশ একটা উত্তেজনা হবে ভাবলাম। ও বাবা কোথায় কী!! সুন্দর একখানা অভ্যর্থনা তোরণ ভুটান রাজের পক্ষ থেকে। এপারে স্বদেশ, ওপারে বিদেশ। তোরণ খানার এপাশ ওপাশ যে আলাদা তা কিন্তু বেশ বোঝা যায়, আর সেটা খানিক লজ্জাও দেয়। ওপারটা যতখানি পরিষ্কার, সাজানো, শিল্পীত, এপারটা ততখানিই ঘিঞ্জি, এলোমেলো ইঁটকাঠের জঙ্গল। ভূগোল খানাও ভারী অদ্ভুত। যতখানি এদেশের ততখানি সমতল, ওদেশে ঢোকামাত্রই পাহাড়ের মায়া আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে শুরু করে।

বিদেশের প্রথম ভূভাগটির নাম ফুন্টশিলিং, মানে ওই তোরণ এর ওপারটার নাম আর কি! নামখানাই কি সুন্দর তাই না? আরও সুন্দর লেজুরটুকু- দ্য রয়্যাল কিংডম অফ ভুটান। যাওয়ার পথে কিছুটা সময় ফুন্টশিলিং এ কাটাতেই হয় পারমিশন এর জন্য। সেসবের বাধা পেরিয়ে শুরু হয় পাহাড় বেয়ে ওঠা। তবে সকাল সকাল যাত্রা শুরু করাই শ্রেয়। "হালকে হালকে কোহরে কি ধুঁয়া" শুনতে যতখানি ই মধুর হোক না কেন, এই পাহাড়ের চড়াই উৎরাই এ সে এসে পড়লে আর এগোবার উপায় থাকে না। সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়লাম। খানিক এগোতেই ফুন্টশিলিং মনাস্ট্রি। রাজা যখন সীমান্ত দর্শনে বেরোন, এখানে থাকেন। কী শান্ত মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। এখান থেকে নীচে তাকালেই চওড়া বুক পেতে বয়ে চলেছে জলঢাকা। ওই তো নীচে আমার দ্যাশ- জয়গাঁও। সদ্য ছেড়ে আসা দেশের মায়াও ভারী অদ্ভুত! সে মায়া কাটিয়ে বিখ্যাত চুখা বিদ্যুৎপ্রকল্পের গা ঘেঁষে যখন এগোচ্ছি পাহাড়ের মাথা থেকে হইহই করে, ঠিক অশ্বারোহী সেনার মত নেমে আসে মেঘেদের দল। মুহুর্তের মধ্যে বন্দী করে নেয় আমাদের। এ বন্দীদশা ভারী আহ্লাদের! কখন ও রুক্ষ কখন ও বা সজীব হয়ে ধরা দেয় আশপাশ। জনপদ পেরোনোর সময় চোখ টানে ভুটানি শিশুরা। চোখ টানে জায়গায় জায়গায় রাস্তার পাশে বিশ পঁচিশ কমলালেবু নিয়ে বসে থাকা নারীপুরুষ আর তাদের পোষাক। লম্বা লম্বা গাছের এলাকা ছাড়িয়ে কাঁটা গুল্মে এসে পড়ি, পাহাড়ের রঙ বদলায়। কখন অন্য কোন খান থেকে এসে পাশেপাশে চলতে থাকে পাহাড়ি নদী। গভীর গিরিখাতের ভিতরে কাজলকালো তার জল, মাইকেলের কপোতাক্ষ যেন!

জলের মতই বইতে থাকে সময়, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আটকাতে শুরু করে রোদ্দুর। ঝিম ধরানো ছায়াময় পাহাড়ি পথ চুম্বকের মত টানে, গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করতেই হয়। এক বুক ভালোলাগা ভরে নিয়ে আবার চলার শুরু। দুপাক খেতেই আবার কোথা থেকে যেন অন্য কোনো সুয্যিদেব এসে নিজের তেজ দেখাতে শুরু করেন। এমন করতে করতেই ঝুপ করে সন্ধে নেমে যায়। রাজধানী শহরের কাছাকাছি এসেছি বোঝা যায় আশপাশ দেখেই। আবারও অভ্যর্থনা তোরণ। তাকে পেরোলেই যেন ঠাকুরমার ঝুলির দৃশ্যপট চোখের সামনে ধরা পড়ে। মনে হয় যেন বিশ্বকর্মা স্বয়ং এসে অতি যত্ন করে, 'আপন মনের মাধুরী মিশায়ে' রাজাকে তার রাজধানী উপহার দিয়ে গেছেন। রাজা আর তার প্রজারাও ভারী যত্নে সেই উপহার কে সাজিয়ে রেখেছেন। সেই জাদুরাজ্যের রাস্তার দুপাশে যাই দেখি সবই যেন এক একটি শিল্পকর্ম। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার কী অনবদ্য মেলবন্ধন! হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় হোক বা পেট্রোল পাম্প, সাধারণ দোকানপাট, সবই রাজবাড়ির আদলে। প্রতিটি বাড়িতে শিল্পের ছোঁয়া। খুব ব্যস্ত রাস্তার পাশেও উইলো গাছের সারি। ট্রাফিক পুলিশ, ছাত্র ছাত্রী, হাসিমুখের বিক্রেতা সবার পরনেই ট্রাডিশনাল পোষাক। সকলেই আসাধারন নিয়মনিষ্ঠ কিন্তু কোথাও কখনও ট্রাফিকের ক্যাকাফোনি নেই, জ্যাম ও নেই। কেবলি মনে হয় আমরা কেন পারিনা!

রাজধানীর সর্বোচ্চ স্থানে এক পাহাড়চূড়ায় ধ্যানমগ্ন বুদ্ধদেব। পোশাকি নাম 'বুদ্ধা পয়েণ্ট'। তবে কেন জানিনা মনে হয় অসীম শ্রদ্ধায় শিষ্যেরা তাঁকে মাথার উপরে বসিয়েছেন আর তিনি ও ভারী মমতায় বরাভয় দিচ্ছেন তাঁদের। অনেক দূর অব্দি তাঁর নজর। একইভাবে অনেক দূর থেকে তাঁকেও দেখা যায়। প্রায় প্রতিটি পাহাড়ই রঙিন হয়ে ধরা দেয় বিশ্বাসের রঙে। রঙবেরঙের টুকরো কাপড় পতপত করে ওড়ে। এ দৃশ্য আমাদের সিকিমেও দেখা যায় তবে এমন ব্যাপক ভাবে নয়।

গোটা দেশ জুড়ে সোহাগী নদীরা পাহাড়ের পায়ে পায়ে ঘোরে। পাহাড়ের বাঁক ঘুরলেই তারাও কোথায় না জানি চলে যায়। আবার ফিরে আসে অন্য কোনো বাঁকে। এমন ই এক নদীর ছবি দেখেই ভুটানের প্রতি বিচ্ছিরি আগ্রহ জন্মেছিল। শুধু নদীটুকু নয় অবশ্য, প্রকৃতিসৃষ্ট নদী আর তার উপরে মনুষ্যসৃষ্ট সেতু যে এইভাবে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠতে পারে তা আগে কখনও দেখিনি। যে কোনো সেতুই এক অপরূপ স্থাপত্য। আমাদের মত বাউণ্ডুলেরা এসব দেখে পাগলের মত করতে থাকি তবে বাকিদের জন্য ও খামতি নেই কিছু। দেখে নেওয়া যেতে পারে হস্তশিল্প সংগ্রহশালা, বেশ কিছু জং ( আমরা মনাস্ট্রি, গুম্ফা আর জং এর পার্থক্য টা ঠিক ঠিক ধরতে পারিনি), রাজধানীসুলভ কিছু বন্দোবস্ত মানে পার্ক, স্টেডিয়াম, শৈল্পিক অফিস কাছারি ইত্যাদি। যেটা দেখতেই হয়, রাজার বর্তমান আবাস মানে রাজবাড়ি। দিনের বেলায় দেখে আসাই যায়।তবে সন্ধের সময় যাওয়াটা অন্যরকম। অন্ধকার প্রেক্ষাপটে এক এক করে রঙমিলান্তি খেলায় লাল হলুদ সবুজ আলোয় সেজে ওঠে রাজপ্রাসাদ। সে দৃশ্য চোখে লেগে থাকে অনেকদিন।

থিম্পুর পরের গন্তব্য পারো- পরমা পারো। তার সৌন্দর্য এক এক ঋতুতে এক একরকম। আদতে একটি উপত্যকা। চারিদিক থেকে ঋজু পাহাড়েরা আগলে রেখেছে তাকে। বেশ উদার একখানা নদী অনেক আগে থেকেই পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। তার চওড়া বুকের ঔদার্যে পারো আরো রূপমতী হয়। ঢোকার আগে পাহাড়ের উচ্চতা থেকে চোখে পড়ে পারো এয়ারপোর্ট। জানিনা এত সংক্ষিপ্ত, অনাড়ম্বর অথচ এত সুন্দর এয়ারপোর্ট অন্য কোথাও আছে কিনা। ঠিক যেন পুতুলের দেশ। হাতে গোনা কয়েকটি ফ্লাইট ওড়ে আর নামে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে। ওইখান থেকেই দেখা যায় চেলেলা পাস। দুটো শিখরের মাঝখান থেকে উঁকি দেয়। লোভ দেখায়। অন্যদিকে তাকালেই বিখ্যাত 'টাইগার নেস্ট' গুম্ফা, পাথরের খাঁজে খাঁজে যেন কোনোরকমে আটকে আছে সাদা মেরুনের যুগলবন্দি। নীচে তাকালেই পারো শহর। জীবনে ভারী শান্ত এখানে। দুদণ্ড বসে থাকলেই যেন অপার শান্তি। কানে ভেসে আসে ঐকতান। নিস্তব্ধতার শব্দের সঙ্গে সুর মেলায় নদীর বয়ে যাওয়া, দূর থেকে ভেসে আসা একটা দুটো তিনটে পাখির ডাক। সময় পারমিট করলে ওখানেই রাত্রিবাস করা যায়, আমাদের ফিরে আসতে হয়েছিল থিম্পু।

পরদিন খুব ভোরে বেরোবার কথা বলা ছিল। শুধু জানতাম গন্তব্য পুণাখা, ভুটানের আদি রাজধানী। আর যেটুকু শুনেছিলাম মাঝে পড়বে দোচুলা বা দোচুড়া পাস, সেখানে যত সকালে পৌঁছানো যায়, ততই ভালো। পৌঁছে বুঝলাম ভুটানের আসল টুকুই বাকি থেকে গিয়েছিল। গোটা রাস্তা জুড়ে বরফের চাদর, তাও তখন সূয্যিদেব আকাশজুড়ে বিরাজ করছেন। বাঙালীর সময়জ্ঞানের কুফল ও টের পেলাম হাড়ে হাড়ে। স্নোফল দেখার অভিজ্ঞতা নতুন নয়, তবে এ এক অননুভূত ভালোলাগায় ভরে যাওয়া। স্নোফল কখন হয়েছে জানিনা, রাস্তাঘাট তো বটেই দীর্ঘদেহী গাছগুলো যেন স্যান্টাক্লজের মত উলোঝুলো দাড়িগোঁফ নিয়ে দাঁড়িয়ে। পাস এর ঠিক মাথাটা ফ্ল্যাট, রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গেছে, মাঝখানে একটু উঁচুতে ধর্মীয় স্তম্ভ সাজানো থরে থরে। সামনে বরফশৃঙ্গের মিলমিশ। বেলা বাড়তে ভীড় বাড়ে, টুকটুক করে হাঁটা দি পাশের গাছগাছালির অন্ধকারে, পাহাড়ের ধাপ বেয়ে বেয়ে কখন ও উঠি, কখন ও নামি। মহীরূহের সামনে নিজেকে ভারী দীনহীন মনে হয়। সম্ভ্রমে মাথা তুলে তাকাই, পুষ্পবৃষ্টির মত টুপটাপ করে ঝরতে থাকে ঝুরো বরফ। মন চাই জীবনের বাকি দিনগুলো ওখানেই বসে থাকি। কোথায় যেন যাওয়ার ছিল... সম্বিৎ ফেরে, যাত্রা শুরু হয়।

পুণাখার দুরত্ব বেশ অনেকটাই। দেশের একেবারে ভিতরে রাজধানী গড়ে তুলেছিলেন রাজা, পরে আধুনিকতার দায়ে থিম্পুতে তুলে আনা হয় সম্ভবত। দূর থেকেই দৃষ্টিগোচর হয় ইতিহাসের সাক্ষী, বর্তমানের দোসর- পুরোনো রাজপ্রাসাদটি। এখন ওটি একটি জং। অনেক লামা থাকেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ। একদল প্রবাহিত করেন ধারাবাহিতা, অন্যদল প্রবাহিত হন। কালের নিয়মে এভাবেই চলতে থাকে। ঢুকতেই স্মারক তোরণ - বর্তমান রাজা রাণী তাদের জীবনশুরুর কর্মকাণ্ড সম্পাদন করেছিলেন এইখানেই, তারই বিস্তৃত বিবরণ। শিকড়ের টান বলে মনে হল বা রীতি, রেওয়াজ, পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেসব দেখতে পেলেও স্বস্তি বোধ হয়। নদীর ওপর চমৎকার সেতু পেরিয়ে প্রবেশ করতে হয়। পরিখা নয় কিন্তু - নদী।আসলে দুদিক থেকে দুটি নদী এসে মিলে এক হয়ে গেছে। ওই সঙ্গমে ব-দ্বীপের মত এক চড়ায় এই স্থাপত্য। একই শৈলী, একই রঙ। নদী দু'খানি নিয়ে এক বিশ্বাসের গল্প আছে। একটি নদী খরস্রোতা, সেটি পুরুষ, আর একটি শান্ত, সেটি নারী। দুজনের মিলনক্ষেত্রে গড়ে উঠেছে ভুটান রাজপরিবার। জীবনের কী অপূর্ব সংজ্ঞা! প্রাসাদের ভেতরের ব্যাপ্তি এতটাই যে একবেলায় দেখে শেষ করা যায় না। প্রার্থনাসভার নিস্তব্ধতা আর অগণিত লামামুখের বৈচিত্র্যতা বুকে নিয়ে ফিরে আসি। আসার পথে নদীর ধারে নেমে পড়ি। 'আইসিং অন দ্য কেক' এর মত নজরে পড়ে শয়ে শয়ে পরিযায়ী পাখি। তাদের ডাক আর নদীর বয়ে চলা যেন সবটুকুকে সম্পূর্ণতা দেয়।কানায় কানায় ভরে যায় হৃদয়পাত্রখানি।

লেখা - নিবেদিতা ঘোষ

Page No :